আল্লাহর ইচ্ছা দুই রকম সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ
অনেকেই প্রশ্ন করেন — আল্লাহ যদি সর্বশক্তিমান হন, তাহলে পৃথিবীতে এত পাপ, অন্যায়, জুলুম কেন হয়?
তিনি কি চাইলে এগুলো বন্ধ করতে পারতেন না? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আল্লাহর ইচ্ছার দুটি প্রকারের মধ্যে।
ইসলামি আকিদাশাস্ত্রে এই দুটি প্রকারকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
একটি হলো ইরাদাহ কাওনিয়া এবং অপরটি হলো ইরাদাহ শরইয়া। এই দুটির পার্থক্য না বুঝলে ইসলামের তাকদির, স্বাধীন ইচ্ছা এবং ন্যায়বিচার সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর অধরাই থেকে যায়।
প্রথম প্রকার: ইরাদাহ কাওনিয়া (সৃষ্টিগত ইচ্ছা)
ইরাদাহ কাওনিয়া অর্থ হলো আল্লাহর সেই ইচ্ছা যা অবশ্যই পূর্ণ হবে। এটি আল্লাহর সৃষ্টিগত বা বিশ্বজাগতিক ইচ্ছা।
এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে মহাবিশ্বের কোনো শক্তিই দাঁড়াতে পারে না। মানুষ, ফেরেশতা, জিন — কেউই এটি পরিবর্তন করতে সক্ষম নয়।
এই ইচ্ছার বৈশিষ্ট্য:
- – এটি অপরিহার্য এবং অপরিবর্তনীয়
- – এতে মানুষের কোনো স্বাধীনতা নেই
- – এটি আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ যা সৃষ্টির আগেই নির্ধারিত
উদাহরণসমূহ:মৃত্যু: প্রতিটি প্রাণীকে অবশ্যই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। আল্লাহ বলেন “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে।” (সুরা আলে ইমরান ৩:১৮৫)।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাক্তার, সবচেয়ে ধনী মানুষ — কেউই মৃত্যু এড়াতে পারে না।
সূর্য, চাঁদ ও গ্রহ-নক্ষত্রের গতি: আল্লাহ বলেন — “সূর্য তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে চলে এবং চাঁদের জন্য মঞ্জিল নির্ধারণ করেছি।” (সুরা ইয়াসিন ৩৬:৩৮-৩৯)।
কোনো মানবীয় শক্তি সূর্যোদয় বন্ধ করতে পারে না, রাতকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না।
কিয়ামত:মহাপ্রলয় অবশ্যই আসবে। আল্লাহ বলেন — “নিশ্চয়ই কিয়ামত আসবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।” (সুরা হজ ২২:৭)। এটি আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
বৃষ্টি ও রিজিক: কখন বৃষ্টি হবে, কার ভাগ্যে কতটুকু রিজিক আছে — এটি আল্লাহ আগেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। মানুষ চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল আল্লাহর হাতে।
সংক্ষেপে, ইরাদাহ কাওনিয়া হলো আল্লাহর সেই অলঙ্ঘনীয় বিধান যা সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে।
দ্বিতীয় প্রকার: ইরাদাহ শরইয়া (বিধানগত ইচ্ছা)
ইরাদাহ শরইয়া অর্থ হলো আল্লাহর সেই ইচ্ছা বা পছন্দ যা তিনি মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন — অর্থাৎ তিনি কী চান মানুষ করুক।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। মানুষ চাইলে এই বিধান মেনে চলতে পারে, আবার না মানতেও পারে।
এই ইচ্ছার বৈশিষ্ট্য:
- – এটি আল্লাহর পছন্দ ও অপছন্দ সম্পর্কিত
- – মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার সাথে সম্পর্কিত
- – এখানে পাপ ও পুণ্যের হিসাব হয়
- – এটি মেনে না চললে পরকালে শাস্তি আছে
আল্লাহ বলেন — “আমি মানুষকে পথ দেখিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় অকৃতজ্ঞ।” (সুরা ইনসান ৭৬:৩)
বিস্তারিত উদাহরণ: চুরি: আল্লাহ চুরি হতে দেন, কিন্তু তিনি চুরিকে ঘৃণা করেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন — “চোর পুরুষ ও চোর নারী — উভয়ের হাত কেটে দাও।” (সুরা মায়িদা ৫:৩৮)।
যদি চুরি আল্লাহর পছন্দ হতো তাহলে তিনি এর জন্য শাস্তি নির্ধারণ করতেন না।
ব্যভিচার ও ধর্ষণ: আল্লাহ এটি হতে দেন, কিন্তু তিনি বলেন — “ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।” (সুরা ইসরা ১৭:৩২)।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ধর্ষকের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান দিয়েছেন (তিরমিজি ১৪৫৪)।
হত্যা: আল্লাহ খুন হতে দেন, কিন্তু তিনি বলেন — “যে একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল।” (সুরা মায়িদা ৫:৩২)।
এটি ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি।
শিরক ও মূর্তিপূজা: আল্লাহ এটি হতে দেন, কিন্তু তিনি বলেন — “নিশ্চয়ই শিরক সবচেয়ে বড় জুলুম।” (সুরা লুকমান ৩১:১৩)।
এটি একমাত্র পাপ যা আল্লাহ ক্ষমা না-ও করতে পারেন।
মিথ্যা, ঘুষ ও জুলুম: এগুলো আল্লাহ হতে দেন, কিন্তু তিনি বলেন — “আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।” (সুরা আলে ইমরান ৩:৫৭)।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আল্লাহ কেন থামান না?
এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই আসে। উত্তরটি গভীরভাবে বোঝা দরকার।
কারণ ১: দুনিয়া পরীক্ষার হল
আল্লাহ বলেন — “যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন — কে কর্মে উত্তম।” (সুরা মুলক ৬৭:২)
পরীক্ষা তখনই অর্থবহ হয় যখন পরীক্ষার্থীর সামনে সঠিক ও ভুল — দুটো পথই খোলা থাকে।
যদি চুরি করতে গেলেই হাত অবশ হয়ে যেত, মিথ্যা বললেই মুখ বন্ধ হয়ে যেত, ধর্ষণ করতে গেলেই পাথর হয়ে যেত — তাহলে সবাই বাধ্য হয়ে ভালো থাকত।
এটি পরীক্ষা নয়, এটি হবে জোর করে নিয়ন্ত্রণ। তখন জান্নাত-জাহান্নাম, বিচার দিবস, পুরস্কার ও শাস্তি — কোনো কিছুরই আর অর্থ থাকত না।
কারণ ২: আল্লাহ তওবার সুযোগ দেন
আল্লাহ বলেন — “যদি আল্লাহ মানুষকে তাদের জুলুমের কারণে সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও করতেন, তাহলে পৃথিবীতে কোনো প্রাণীই বাকি থাকত না।
কিন্তু তিনি তাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন।” (সুরা নাহল ১৬:৬১)
এই অবকাশ আল্লাহর অসীম দয়ার প্রকাশ। একজন চোর তওবা করে ফিরে আসতে পারে।
একজন হত্যাকারী অনুতপ্ত হতে পারে। একজন পাপী জীবনের শেষ মুহূর্তেও আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে পারে।
কারণ ৩: বিচার দিবসের জন্য
এই দুনিয়ায় সব অন্যায়ের বিচার হয় না। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কিছুই লুকানো নেই। পরকালে প্রতিটি অন্যায়ের পূর্ণ বিচার হবে। সেদিন কেউ এক বিন্দু ছাড় পাবে না।
দায় কার — আল্লাহর নাকি মানুষের?
এটি বোঝার জন্য তিনটি উদাহরণ দেখুন:
বিদ্যুতের উদাহরণ:সরকার সবাইকে বিদ্যুৎ দেয়। একজন সেই বিদ্যুৎ দিয়ে হাসপাতালে রোগীর জীবন বাঁচায়,
আরেকজন সেই বিদ্যুৎ দিয়ে কাউকে শক দিয়ে মারে। বিদ্যুৎ দেওয়ার কারণে সরকার কি খুনের দায়ী? — না।
বাবার টাকার উদাহরণ: বাবা সন্তানকে বই কেনার জন্য টাকা দিলেন। সন্তান সেই টাকা দিয়ে মাদক কিনল। দোষ কি বাবার? — না, দোষ সন্তানের।
আল্লাহর দেওয়া শক্তির উদাহরণ: আল্লাহ মানুষকে হাত দিয়েছেন — সে হাত দিয়ে সাহায্য করা যায়, আবার চুরিও করা যায়।
আল্লাহ চোখ দিয়েছেন — সে চোখ দিয়ে কোরআন পড়া যায়, আবার হারামও দেখা যায়।
আল্লাহ বুদ্ধি দিয়েছেন — সেই বুদ্ধি দিয়ে সত্য খোঁজা যায়, আবার প্রতারণাও করা যায়।
আল্লাহ ক্ষমতা দিয়েছেন বলে তিনি দায়ী নন। দায় মানুষের নিজের।
আল্লাহ বলেন — “তোমাদের উপর যে বিপদ আসে তা তোমাদের হাতেরই কামাই।” (সুরা শুরা ৪২:৩০)
আল্লাহ আরো বলেন — “আল্লাহ মানুষের উপর জুলুম করেন না, মানুষ নিজেরাই নিজেদের উপর জুলুম করে।” (সুরা ইউনুস ১০:৪৪)
উপসংহার
ইসলাম পরিষ্কারভাবে বলে — আল্লাহ সর্বশক্তিমান হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবীতে পাপ হয়, কারণ এটি পরীক্ষার জায়গা।
মানুষ স্বাধীনভাবে পাপ করে, আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে থামান না — কারণ তিনি তওবার সুযোগ দেন এবং পরকালে পূর্ণ বিচার করবেন।
প্রথম ইচ্ছায় যা হয় তা অপরিহার্য — মৃত্যু, জন্ম, কিয়ামত।দ্বিতীয় ইচ্ছায় যা হয় তার দায় মানুষের — চুরি, হত্যা, শিরক।
আল্লাহ কখনো জুলুম করেন না। তিনি সবকিছু দেখছেন, সবকিছু জানেন এবং সঠিক সময়ে পূর্ণ বিচার করবেন।
লিখেছেনঃ মুদাররিস জামেয়া হুসাইনিয়া ইসলামিয়া দারুল হাদীস টাইটেল মাদ্রাসা-ঝেরঝেরীপাড়া সিলেট
01303721460
MuslimBD24.Com Islamic blog site Bangladesh

