Home / সফরনামা / ২০১৭ ইং সনে শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. এর ঐতিহাসিক দেওবন্দ সফর ; অজানা কিছু কথা

২০১৭ ইং সনে শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. এর ঐতিহাসিক দেওবন্দ সফর ; অজানা কিছু কথা

(মুসলিমবিডি২৪ডটকম)

২০১৭ ইং সনে শায়খুল ইসলাম রহ. এর ঐতিহাসিক দেওবন্দ সফর ; অজানা কিছু কথা

‍আমি তখন খুব ছোট। গফরগাঁও মারকায মাদরা‍সায় পড়ি।  আমার মুহতারাম আসাতেযার মুখে হযরত শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ

আহমদ শফী সাহেব রহ.-এর নাম বরাবরই শুনতাম। সে থেকেই তাঁকে আমি চিনি। ১৪২২২৩ হিজরী শিক্ষাবর্ষে আমাদের হিফজ

সমাপনান্তে দস্তারবন্দী মাহফিলে হযরত শায়খুল ইসলামকে প্রধান অতিথি হিসেবে দাওয়াত দেয়া হয়। কিন্তু অনিবার্য কারণে সে বছর

তিনি মাহফিলে আসতে পারেননি। এরপর ১৪৩১ হিজরী সনেফয়জুল উলুমমাদরাসার ইসলাহী মাহফিলে হযরত রহ. কে আমি প্রথম

দেখি। অনুপম এক মুহাব্বত আমাকে ঘিরে ফেলে। মজলিসেই তাঁর হাতে বায়আত হই। সে থেকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ইং (২৯ মুহররম ১৪৪২হিজরী)

ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন মাহফিলে, হেফাজতে ইসলামের একাধিক আন্দোলনে খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখা তাঁর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ হয়েছে।আলহামদুলিল্লাহ

 

আজকের লিখনীতে ২০১৭ ইং সনে হযরত শায়খুল ইসলাম রহ.-এর ঐতিহাসিক দেওবন্দ সফরে‌‍ একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে একগুচ্ছ স্মৃতির দুচারটি তুলে ধরবো। ইনশাআল্লাহ

 

হযরত রহ. এর ভারত সফর:

শারীরিক দুর্বলতা বার্ধক্যজনিত একাধিক রোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ২২ জুলাই ২০১৭ ইং তারিখে হযরত শাইখুল ইসলাম

ভারত সফরে যান। সফরে হযরতের সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন সাহেবযাদায়ে মুহতারাম মাও.ইউসুফ সাহেবমাও.আনাস মা

সাহেব, মরহুম জামাতা মাও. ইসহাক নূর সাহেব মুহতারাম শফিউল আলম সাহেব। 

শায়খুল ইসলামের ভারত সফর যদিও শারীরিক চিকিৎসার জন্য হয়েছিল, কিন্ত  সফরের মূল লক্ষ্য ছিল শেষবারের মতো মাদারে‌‍ ইলমী

দারুল উলুম দেওবন্দ আকাবিরে‌‍ দেওবন্দের সাক্ষাত লাভ করা। আর তাই চিকিৎসার জন্যদিল্লি অ্যাপোলো হসপিটাল কয়েকদিন অবস্থান করেই দ্রুত দারুল উলুম দেওবন্দের পথপানে রওয়ানা হন।  

 

 দারুল উলুম দেওবন্দের আঙিনায়:

১লা আগস্ট ২০১৭ ইং মুতাবেক জিলকদ ১৪৩৮ হিজরী (আমি তখন দারুল উলুম দেওবন্দের  উলুমুল হাদীস বিভাগের সম্মানিত মুশরি

আল্লামা আব্দুল্লাহ মারুফী সাহেব দা. বা.-এর খিদমতে মুআউইন হিসেবে কাজ করি) দেওবন্দে বাঙালি ছাত্রদের মাঝে ব্যাপক গুঞ্জন চলছিল যে,

হযরত শায়খুল ইসলাম দেওবন্দ আসছেন ! সত্যিই কি তিনি দেওবন্দে আসবেন ? হাটহাজারী পড়ুয়া একাধিক ভাইয়ের সাথে

যোগাযোগ করে তাঁর আগমনের বিষয়ে আশ্বস্ত হই। আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করি। 

দারুল উলুমের প্রধান ফটকবাবে কাসিমসংলগ্ন মেহমানখানাটি আজ হযরতের আগমন উপলক্ষে নতুন সাজে সজ্জিত। মজলিসে শুরার (পরামর্শ সভার)

খাস কামরাগুলো হযরত মুহতামিম সাহেবের (আল্লামা আবুল কাসেম নোমানী দা. বা., মুহতামিম বর্তমান শায়খুল হাদীস,

দারুল উলুম দেওবন্দএর) নির্দেশে হযরত শাইখুল ইসলাম তার সফরসঙ্গীদেরক্বেয়ামগাহ‘ (বিশ্রামস্থল) হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে

 

আমি সেদিন কোনো কাজে দারুল উলুম থেকে বাইরে বেরোচ্ছিলাম। হঠাৎ মাদ্রাসার গেটে, মেহমানখানার আশপাশে আগ্রহি   ছাত্রদের

ুক ভিড় পড়ে।লিসানে হালথেকে বুঝতে পারি যে, হযরত শায়খুল ইসলাম তাশরীফ এনেছেন। ভিড় ঠেলে আমিও

তাদের পাশে দাঁড়ালাম। দূর থেকে তাঁর বিমোহিত হলাম। 

 

বড়দের দিলে হযরত শায়খুল ইসলামের মাকাম:

উম্মুল মাদারি দারুল উলুম দেওবন্দের প্রবাদপুরুষ, শাইখুল আরব ওয়াল আজমশাইখুল ইসলাম হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.

(সাবেক শায়খুল হাদীস সদরু মুদাররিসীন, দারুল উলুম দেওবন্দ)-এর স্নেহভাজন, বিশিষ্ট শাগরিদ খলিফা আল্লামা শাহ আহমদ শফী ছাহেবের

দেওবন্দ আগমনের সংবাদ দ্রুতবেগে দারুল উলূমের সীমা পেরিয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মেহমানখানায় সাক্ষাৎপ্রার্থী উলামাতলাবাদের হুজুম (ভিড়) বাড়তে থাকে।

একে একে দারুল উলুম দেওবন্দের আসাতেযায়ে কেরাম সেখানে আসেন। হযরত মাও. জামিল সেক্রেডোবী সাহেব, মাও. নাসিম বারাবাংকাভী সাহেব,

  মাও.আব্দুল্লাহ মারুফী সাহেব, মাও. ক্বারী শফীক ছাহেব দা. বা. ছাড়াও বেশ কয়েকজন আসাতেযায়ে কেরা সেদিন মেহমানখানায় আসেন

 

হযরত মুহতামিম ছাহেব দা.বা. কর্তৃক বিশেষ দাওয়াত:

 দারুল উলুম দেওবন্দের সম্মানিত মুহতামিমনমুনায়ে আসলাফ হযরত মুফতি আবুল কাসেম নোমানী ছাহেব দা.বা. শায়খুল ইসলামকে নাস্তার দাওয়াত দেন।

তিনি (মুহতামিম ছাহেব) বিদেশি মেহমানদের মেজাজ অনুযায়ী নাস্তার এন্তেজাম করেন। খাবার শেষে দুজনের ভাব বিনিময় চলতে থাকে।

এক পর্যায়ে শাইখুল ইসলাম রহ. মুহতামিম ছাহেব কে লক্ষ্য করে বলেন

“آج کل میرے جسم میں طرح طرح کی بیماریاں آگیی ہیں۔اور اسی وجہ سے میں بہت کمزور ہوگیاہوں”

ইদানিং নানা রোগে ভুগছি, একারণেই আমার শরীর অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। কথা শুনতেই মুহতামিম ছাহেব দা.বা. শায়খুল ইসলামের মনোবল বৃদ্ধির জন্য তৎক্ষণাৎ বলে উঠেন

حضرت! جو کام کرنے والا ہے وہ بیکار نہیں بیٹھتا

হযরতকাজের মানুষ অযথা বসে থাকে না।

হৃদয়ের বাণী হৃদয়কে আন্দোলিত করে তোলে, শায়খুল ইসলামের চোখে মুখে হাসির ঝলক ফুটে ওঠে। বেশ কিছু সময় কথা চলতে থাকে।

কথার এক ফাঁকে তিনি (শায়খ) আপন পৌত্র মুহতারাম আসআদএর ব্যাপারে আলোচনা করেন। 

হযরত মুহতামিম ছাহেবের সে সময়কার খাদেম স্নেহাস্পদ মাও. মেহরাব নোমানী মোবারক মজলিসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন যে,

আমি গত দুবছরে হযরত মুহতামিম ছাহেবকে কোন মেহমানের জন্য এত ব্যাকুল হতে দেখিনি।

 

মেহমান খানায় হযরত মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ.-এর শুভাগমন:

দারু উলুম দেওবন্দের সাবেক শাইখুল হাদিস সদরু মুদাররিসীন হযরতুল আল্লামা মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. সময়ের বেশ পাবন্দ ছিলেন।

প্রতিদিন বাদ আসর তার বাসায় ইলমী মজলিস হত। সে মজলিসে তিনি মেহমানদের সাথে সাক্ষাত করতেন। সময় ছাড়া অন্য সময়ে

সাক্ষাত করাকে তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। হযরত শায়খুল ইসলাম রহ. দেওবন্দের সফরে হযরতুল উসতায মুফতি

সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ.-এর সাথে সাক্ষাতের পোষণ করেন। এরই প্রেক্ষিতে অধম (প্রবন্ধকার) হযরতুল উসতায পালনপুরী রহ. কে

শায়খুল ইসলামের মনোবাঞ্ছার কথা জানাই। তাঁর আগমনের সংবাদে তিনি (হযরত পালনপুরী রহ) যারপরনাই আনন্দিত হয়ে অধমকে লক্ষ্য করে বলতে থাকেন

عشاء کے وقت سواری لیکر آجانا، ہم خود ان سے جاکر ملینگے۔

 

 “এশার সময় সওয়ারি নিয়ে এসো, আমরাই তাঁর কাছে গিয়ে সাক্ষাত করবো

 হযরতুল উসতায পালনপুরী রহ.-এর সাথে কথা শেষ করে মোবাইল যোগে মেহমানখানায় অবস্থানরত শাইখুল ইসলামের

সফরসঙ্গীদেরকে তাঁর (পালনপুরী রহ.-এর)আগমনের বিষয়ে অবহিত করি

 

হযরতুল উসতায পালনপুরী রহ. খেলাফে মামূল কারো সাথে সাক্ষাত করতে মেহমানখানায় আসবেন, বিষয়টি ছাত্রদেরকে কৌতুহলী করে তোলে

এশার সময় ঘনিয়ে এসেছে, ঘড়ির কাঁটা আটটা পেরিয়ে পঁচিশ মিনিটে। বেশ কিছু ছাত্র শায়খুল ইসলামের কক্ষের সামনে অবস্থান নেয়।

যথাসময়ে হযরতুল উসতায পালনপুরী রহ. অটোরিক্সা যোগে মেহমানখানায় তাশরীফ আনেন। খুবই অকৃত্রিমভাবে তিনি শায়খুল ইসলামের কক্ষের দিকে অগ্রসর হন।

শাইখুল ইসলাম অজু  করছিলেন। অজু সেরে‌‍ দুজনের কাঁধে (সম্ভবত মাও.আনাস মাদানী মাও. শফিউল আলমের কাঁধে) ভর করে

তিনিও হযরতুল উসতায পালনপুরী রহ.-এর দিকে এগিয়ে আসেন। দূর থেকে দৃষ্টি বিনিময়ে সালাম কালামের সূচনা হয়

 শাইখুল ইসলাম হযরত পালনপুরী রহ. কে লক্ষ্য করে উচ্চ আওয়াজে বলে উঠেন

مفتی صاحب ! ایسا کوئی دن نہیں جاتا کہ میں آپ حضرات کے لیے دعانہیں کرتا-

মুফতি ছাহেব! এমন কোন দিন যায় না, যেদিন আমি আপনাদের জন্য দোয়া করি না।

 একথা শুনে হযরতুল উসতায  পালনপুরী রহ. বেশ আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেন! প্রাণখুলে শায়খুল ইসলামের জন্য দোআর বাক্যমালা শোনাতে থাকেন

 

 উভয় শায়খের সাক্ষাত পর্ব প্রত্যক্ষ করার জন্য ছাত্রদের বড় একটি দল মেহমানখানার সে কক্ষটিতে জড়ো হন। যেহেতু হযরতুল উসতায

পালনপুরী রহ. অধিক ভিড় পছন্দ করতেন না; তাই ছাত্ররা এক দু মিনিটের মধ্যেই কক্ষ ত্যাগ করেন। এরপর মহান দুই প্রবাদপুরুষ পরস্পরে প্রায় পঁচিশ মিনিট ধরে

একান্ত আলাপচারিতায় মগ্ন থাকেন ( সময় মাও.আনাস মাদানী ছাহেব, মাওঃ ইউসুফ ছাহেব ছাড়াও আরো দুএকজন শায়খুল ইসলামের আশপাশে ছিলেন।

আমি অধম (প্ৰবন্ধকার) হযরতুল উসতায পালনপুরী রহ.-এর নগন্য খাদেম হিসেবে সেখানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য লাভ করেছিলাম।)

 

পঁচিশ মিনিটের আলাপচারিতায় দারুল উলুম দেওবন্দের তৎকালীন শায়খুল হাদীস সদরু মুদাররিসীন হযরতুল উসতায্ *পালনপুরী রহ. দুটি বিষয়ের প্রতি শায়খুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন:*

 

. উর্দু ভাষায় বাঙালি ছাত্রদের আরো পারদর্শী করে তোলা। কওমি মাদ্রাসার কিছু কিতাব উর্দুতে পাঠদান করানো। হযরতুল উসতায রহ. বলেন

١-اردو زبان کو فروغ دینا; فرماتے ہیں کہ  : 

“چونکہ ہم دیوبندی ہیں اسلیے دیوبند کےاکابر کی جو کتابیں ہیں اور انھوں نے قرآن و حدیث کو جو سمجھا ہے وہ ڈائریکٹ انکی کتابوں سے مطالعہ کرینگے اور انکی ساری کتابیں یاتو اردو میں یا عربی میں یا فارسی میں، زیادہ تر کتابیں تو اردوہی میں ہیں۔”

  উর্দু ভাষার প্ৰচলন করা: “যেহেতু আমরাদেওবন্দী, তাই দেওবন্দিয়াতের মাসলাকগত অনিবার্য দাবি হচ্ছে যে, আমাদের আকাবিরে

দেওবন্দের কিতাবসমূহ বিশেষত তাদের ব্যাখ্যাকৃত কোরআন হাদিসের মর্মার্থ সরাসরি তাদের কিতাব থেকে গভীরভাবে অনুধাবন

করাএবং তাদের যোগ্য উত্তরসূরি হওয়াআর আকাবিরদের সকল কিতাব উর্দু, আরবি অথবা ফার্সি ভাষায়। বেশিরভাগ কিতাব উর্দু ভাষাতেই রচিত।“(ভাবানুবাদ)

 

٢-بدعت سے ملک کو بچانا؛  فرماتے ہیں کہ “بنگلہ دیش میں بدعت بہت تیزی سے بڑھ رہی ہے۔اور اگر وہاں کی صورت حال یہی رہی تو وہاں  اپنے اکابر کی ساری محنتیں رائگاں ہوجائیں گی۔”

. বিদআত থেকে দেশকে হেফাজত করা:  (বাংলাদেশে চলমান নানা প্রকার বিদআতের বিষয়ে হযরতুল উসতায পালনপুরী রহ. শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন🙂

বাংলাদেশে বিদআত খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে; যদি সেখানে এর ক্রমবর্ধমানতা চলতে থাকে, তাহলে সে দেশের মাটিতে আমাদের বুযুর্গদের (উলামায়ে দেওবন্দের) দ্বীনের মেহনত তার ফসল সব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।” (ভাবানুবাদ)

 

মোলাকাতের পুরোসময়ধরে পরস্পরে একে অন্যের প্রতি পূর্ণ ইহতিরা সম্মান প্রদর্শন করতে থাকেন। সময় শাইখুল ইসলাম রহ.

দেওবন্দে পড়াকালে নিজের আসাতেযা, বিশেষত শায়খুল আরব ওয়াল আজম হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর প্রতি সীমাহীন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে গিয়ে বলেন :

میں تو حضرت مدنی قدس سرہ کے دربار کا ایک ادنی غلام تھا۔

আমি তো হযরত মাদানী রহ.-এর দরবারের এক নগণ্য গোলাম ছিলাম।

 

শায়খাইনের প্রস্থান:

শাইখুল ইসলাম রহ. এবং হযরতুল উসতায পালনপুরী রহ.-এর উষ্ণ সাক্ষাত পর্বটি প্রায় পঁচিশ মিনিট চলতে থাকে (রা . ৩০ মিনিট থেকে . ৫৫ মিনিট পর্যন্ত)

দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা রাত টার ঘরে ছুঁই ছুঁই এদিকে মসজিদে  ক্বদিমে এশার জামাত রা টায়

এশার জামাতে শরিক হওয়ার কথা বলে হযরত পালনপুরী রহ. উঠে দাঁড়ালেন। আবারোদুজন কাছাকাছি হয়ে  মুসাফাহা করলেন। একে অন্যের কাছে দুআর দরখাস্ত করে বিদায় নিলেন

 

আহ! আল্লাহ তাআলার মর্জি। আজ এমন মুহূর্তে কথাগুলো লিখছি, যখন আমাদের উভয় শায়খ আল্লাহ তাআলার ডাকে সাড়া দিয়ে

পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। মনে হয় এরইমধ্যে ইল্লিয়ীনে রুহের বিশ্রামাগারে আবারো তাদের সাক্ষাত হয়ে গেছে। গত ২৫ রমজানুল মোবারক

১৪৪১ হিজরী মোতাবেক ১৯ মে ২০২০ ইং সকালে হযরতুল উসতায আল্লামা মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী ছাহেব ভারতের মুম্বাই শহরের

নিউ সঞ্জীবনীহসপিটালে ইন্তেকাল করেন। এর ঠিক ১২১ দিন পর, গত ২৯ মুহররম ১৪৪২ হিজরী মুতাবেক ১৮ সেপ্টেম্বর বিকালে আমাদের মহান শায়খ

শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী ছাহেব রাজধানী ঢাকারআসগর আলিহসপিটালে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের উভয় শায়েখকে জান্নাতের উঁচু মাকাম নসিব করুন। আমিন

 

মাওলানা সায়্যিদ আরশাদ মাদানী ছাহেব দা. বা. -এর হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা :

হযরত শাইখুল ইসলামের দেওবন্দ অবস্থানকালে উসতাযে মুহতারাম মাওলানা সায়্যিদ আরশাদ মাদানী ছাহেব দা.বা.

(মেজো সাহেবযাদা, হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এবং বর্তমানে সদরু মুদাররিসীন, দারু উলুম দেওবন্দ) বিশেষ প্রয়োজনে বহির্বিশ্বের সফরে ছিলেন।

সেখান থেকেই তিনি দেওবন্দে নিজের পরিবার পরিজনকে শাইখুল ইসলাম রহমাতুল্লাহ আলাইহি সার্বিক খোঁজখবর রাখার তাগিদ দেন।

আর তাই হযরত মাদানী সাহেব দা.বা.-এর সাহেবযাদাগণ বিশেষত মাওলানা আজহার মাদানী ছাহেব সার্বক্ষণিক শায়খুল ইসলামের

খোঁজখবর রাখেন। এক সন্ধ্যায় বিশেষ দস্তরখানের নিমন্ত্রণ জানান

 

মাওলানা আসজাদ মাদানী ছাহেব দা.বা.-এর মোলাকাত:

শাইখুল ইসলামের সাথে মোলাকাত করতে দারুল উলুমে তাশরীফ আনেন, আওলাদে রসূল মাও.সাইয়েদ আসজাদ মাদানী ছাহেব দা.বা.

(ছোট সাহেবজাদা,হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.) সময় তিনি আপন পিতার প্ৰতিচ্ মহান বুযুর্গের সাথে কিছু সময় কাটান।

তার কাছে বিশেষ দুআর আবেদন করেন। শাইখুল ইসলাম রহ. সাহেবযাদায়ে শায়েখ মাও. আসজাদ মাদানী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

হালপুরসী করেন। নিজের উপর মাদানী খান্দানের সীমাহীন এহসানের কথা স্মরণ করেন। পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর যাবত দেওবন্দ আসতে না পারায় ইতস্তত বোধ করে বিনীত স্বরে বলেন

صدسالہ کے بعد سے میں آپ حضرات کی خبر نہیں لے سکا، اسلیے معذرت چاہتاہوں-

 “সদ সালা (১৯৮২ ইং সনে দারুল উলুম দেওবন্দের শতবার্ষিকী দস্তারবন্দী মাহফিল) এর পর দেওবন্দে এসে আপনাদের খোঁজখবর নিতে পারিনি। আমায় ক্ষমা করবেন।

 

মাও.মাহমুদ মাদানী ছাহেব দা.বা.-এর আন্তরিকতা:

শায়খুল ইসলামের ভারত সফরের পুরো সময়ই মাও. মাহমুদ মাদানী ছাহেব দা.বা. (পৌত্র হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.,

মহাসচিব, জমিয়তে উলামা হিন্দ) তাঁর সর্বপ্রকার খিদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। বিশেষত চিকিৎসা বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন।

দিল্লী দেওবন্দে স্বীয় বাসভবনে শাইখুল ইসলাম তাঁর  সফরসঙ্গীদের কেয়াম বিশেষ আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন

 

মাতৃক্রোড়ে মহাবীর:

  বছর (২০১৭ ইং সনে) হযরত শাইখুল ইসলাম রহ. দারুল উলুম দেওবন্দে মেহমানে খুসুসী (বিশেষ মেহমান) হয়ে এসেছেন।

তিনি তো মায়েরই সূর্যসন্তান। এই তো যুগ (৭২ বছর) আগে মাদারে ইলমি থেকে ফারেগ হয়ে তিনি স্বদেশ ফিরেছেন।

রন্ধ্রে রন্ধ্রে দেওবন্দী আদর্শ চেতনা লালন করেছেন। আবনায়ে দারুল উলুম হওয়ার ্ব আদায় করেছেন। আজ তিনি শেষবারের

মতো সে মাতৃক্রোড়েই ফিরেছেন। ঘুরে ঘুরে মাকে দেখবেন না, তা কি করে হয়

 

পূর্বপরিকল্পনা মুতাবিক আজ বিকেলে শাইখুল ইসলাম রহ.’জম্মেগফীরভক্তঅনুরক্ত সফর সঙ্গীদের নিয়ে বের হলেন। হুইল চেয়ারে বসা

বয়সের ভারে ন্যুব্জ পড়ন্ত বিকেলের পরিশ্রান্ত মহাবীর। দারুল উলুমের প্রধান ফটকবাবে কাসিমদিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন,

একটু সামনেই নয় দরজা বিশিষ্ট ছোট বারান্দানওদারা‍’ স্মৃতিবিজড়িত নওদারা সামনে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করলেন।

(৩১ মে ১৮৬৬ ইং সনে দেওবন্দ গ্রামের মসজিদে ছাত্বায় ছোট্ট পরিসরে দারুল উলুম দেওবন্দের পথচলা। এরপর ৩১ ডিসেম্বর ১৮৭৫ ইং সনে

সর্বপ্রথম নয় দরজা বিশিষ্ট এই ইমারতনওদারা‍’ নির্মাণ করা হয়। কথিত আছে যে, দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক মুহতামিম মাও. রফি উদ্দিন ছাহেব

একরাতে স্বপ্ন যুগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলেন। নবী সানিজ হাতে এখানে মাদ্রাসা নির্মাণের জন্য দাগ টেনে দিলেন।

ঘুম থেকে জেগে মুহতামিম ছাহেব দাগটি হুবহু সেখানে দেখতে পেলেন। এরপর সে জায়গাতে নওদারা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। (তারিখে দারু উলুম ১ম খন্ড)

 

নওদারা সামনে খানিকটা খোলা জায়গা। এর ঠিক মধ্যখানে দুটি বকুল গাছজায়গাটিকেএহাতা মুলসরী‘ (বকুল চত্বর) বলা হয়।

এহাতা মুলসরীর উত্তরপূর্ব কোণের ছোট্ট কূপটির কথা শাইখুল ইসলাম আজো ভোলেননি। কূপ থেকে পানি আনতে বললেন। মন ভরে পানি খেলেন।

কিছু পানি বরকত স্বরূপ প্রিয়জনদের জন্য সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথাও বললেন। (কথিত আছে যেদেওবন্দ প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে একবার

মাও. শাহ রফিউদ্দিনসাবেক মুহতামিমস্বপ্নে দেখলেন যে, এই কূপটি দুধে ভর্তি হয়ে আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে দুধ বণ্টন করছেন।

দলে দলে লোকজন সেখানে এসে সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়া সাল্লামের হাতে দুধ পান করছে। কারো হাতের পাত্র বড়। কারোটা ছোট। ঘুম থেকে জেগে হযরত মুহতামিম ছাহেব স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলেন এভাবে

কূপভর্তি দুধ হলইলমে নবুওয়াত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে দুধ পানকারীরাএখানকার ছাত্র হবেন।

পাত্র ছোটবড় হওয়ার অর্থ ছাত্ররা নিজ নিজ মেহনত মুজাহাদা ইখলাস অনুসারে কমবেশি ইলম অর্জন করবে। (তারিখে দারু উলুম ১ম খন্ড)

 

হাফ্তম (মিশকাত) দরসগাহের গাঘেঁষা সরু রাস্তা দিয়ে আস্তে আস্তে ফোয়ারার সামনে এলেন। চারদিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখলেন।

সামনে প্রাণস্পর্শী ইতিহাস বিজড়িতবাবুয যাহির‘ ‘দারুল কুরআন‘ ‘শাইখুল হিন্দ একাডেমি‘ ‘মেরাজ গেট‘ ‘দারুত তাফসীরদারুল হাদিসএর গম্বুজবিশিষ্ট ইমারত।

হাতের ডান দিকেমাদানী গেট আপন শায়েখ মুর্শিদ হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ পথ দিয়ে আসাযাওয়া করতেন।

শায়খুল ইসলাম রহ. গেট দিয়েই বের হয়েমাকবারায়ে কাসেমী‘ (কাসেমী কবরস্থান) এর দিকে অগ্রসর হলেন। 

 

আপন শায়েখের সান্নিধ্যে:

 দারুল উলুমের পূর্বপাশের ছাত্রাবাসআজমী মঞ্জিলআজমত হসপিটালসংলগ্ন মাকবারায়ে কাসেমী। এখানে আমাদের বহু আকাবির শায়িত আছেন।

সেদিন বিকেলে শাইখুল ইসলাম রহ.কয়েক মুতাআল্লিকীন সহ মাকবারায়ে কাসিমীতে যান। আপন শায়েখ হযরত মাদানী রহ.-এর কবর যিয়ারত করেন।

সে সময় অন্যান্য আকাবির আসাতেযার কবরও যিয়ারত করেন। বিশেষত হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানুতবী রহ., শাইখুল হিন্দ মাও. মাহমুদ হাসান দেওবন্দী,

আল্লামা ইব্রাহীম বলয়াভী, শায়খুল আদব মাও. জাজ আলী আমরোহী, হাকিমুল ইসলাম কারী তায়্যিব ছাহেব রহ. প্ৰমুখ বুযুর্গের কবর। ….

 

স্বদেশ  প্ৰতা্বর্তন:

ভারতের দিল্লী দেওবন্দে প্ৰায় চৌদ্দ দিনের সফর শেষে  আগষ্ট২০১৭ ইং(১২ জ্বিলকদ১৪৩৮হি.) শনিবার বিকেলে হযরত শায়খুল ইসলাম রহ.

দিল্লী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানযোগে ঢাকায় ফেরেন। ঢাকায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন।

রাত সাড়ে ৮টায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত রহ. আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।  

বিমানবন্দরে নামার পর হযরত শায়খুল  ইসলাম রহ.কে বিপুল অভ্যর্থনা গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়।এ সময়  বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন,

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ছাহেব, মুফতি জসীম উদ্দীন ছাহেব , মাওলানা মাহমুদুল হাসান ফতেপুরী ছাহেব, মুফতি নূর আহমদ ছাহেব,

মাওলানা শোয়াইব আহমদ ছাহেব, মুফতি কেফায়েত উল্লাহ ছাহেব, মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়জী ছাহেব সহ আরো অনেক ওলামায়ে কেরা

 

বিমান বন্দরে নেমেই হযরত রহ. উপস্থিত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন মহান আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করেন

 

আল্লাহ তাআলা আমাদের মহান মুরুব্বীকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উঁচু মাকাম নসীব করুন। আমাদেরকে তাঁর পদান্ক অনুসরণের তাওফিক দান করু

  

 

 

মুফতি আব্দুর রহমান নাঈম কাসেমী

সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া মাহমুদিয়া দেশীপাড়া গাজীপুর

খতিব, কাথোরাবায়তুল আক্বসা জামে মসজিদ গাজীপুর সিটি 

+8801987402585

About Muhammad Abdullah

আমি মাওলানা মোঃ আব্দুল্লাহ। 15ই এপ্রিল 1994 ঈসায়ি রোজ শুক্রবার মৌলভীবাজার জেলার হামরকোনায়( দাউদপুর) জন্মগ্রহণ করি। শিক্ষা জীবনের শুরুটা প্রাথমিক বিদ্যালয় দিয়ে হলেও 4 বছরের মাথায় ইসলামিক শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে নিজ উদ্যোগে মাদ্রাসায় ভর্তি হই! আলহামদুলিল্লাহ! সর্বশেষ 2017 ঈসায়ি কওমি মাদ্রাসার উচ্চতর ডিগ্রী মাস্টার্স (দাওরায়ে হাদিস) হযরত শাহ সুলতান রহ. মাদ্রাসা থেকে আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল ক্বওমিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করি! নিজে যা কিছু জেনেছি তা লিখনীর মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এবং আমৃত্যু ইসলাম ও মানবতার সম্পর্কে জানতে ও জানাতে এই সাইটের সাথে সংযুক্ত হয়েছি! আল্লাহ আমাকে ও সবাইকে কবুল করুন।আমিন!!!

Leave a Reply

Powered by

Hosted By ShareWebHost