Breaking News
Home / শবে-বরাত / পবিত্র শবে কদর নিয়ে পর্যালোচনাঃ নঙ্গে আসলাফ আফজাল

পবিত্র শবে কদর নিয়ে পর্যালোচনাঃ নঙ্গে আসলাফ আফজাল

(মুসলিমবিডি২৪ডটকম)

পবিত্র শবে কদর নিয়ে পর্যালোচনাঃ নঙ্গে আসলাফ আফজাল

  بسم الله الرحمن الرحيم

রমযান মাসের রাত্রগুলির মধ্য হইতে একটি রাত্রকে বলা হয়।

যাহা খুবই বরকত ও কল্যাণের রাত্র । কালামে পাকের মধ্যে উহাকে হাজার মাস হইতেও উত্তম বলা হইয়াছ।

হাজার মাসে তিরাশি বৎসর চার মাস হয় । অত্যন্ত ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যাহার এই রাত্রে এবাদত করার তওফীক হইয়া যায়।

কারণ, যে ব্যক্তি এই রাত্রটি এবাদতের মধ্যে কাটাইয়া দিল সে যেন তিরাশি বছর চার মাসের বেশী সময় এবাদতে কাটাইয়া দিল।

আর এই বেশীরও পরিমাণ আমাদের জানা নাই যে, ইহা হাজার মাসের চাইতেও কত মাস বেশী উত্তম।

যাহারা এই মোবারক রাত্রের কদর বুঝিয়াছে তাহাদের জন্য উত্তম ।

যাহারা এই মোবারক রাত্রের কদর বুঝিয়াছে তাহাদের জন্য বাস্তবিকই ইহা আল্লাহ তায়ালার একটি বড় মেহেরবানী যে,

তিনি দয়া করিয়া এমন একটি অপরিসীম নেয়ামত দান করিয়াছেন।

’দুররে মানসূর’ কিতাবে হযরত আনাস (রাযিঃ) হইতে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের

একটি একটি এরশাদ নকল করা হইয়াছে যে, আল্লাহ তায়ালা শবে কদর আমার উম্মতকেই দান করিয়াছেন,

পূর্ববর্তী উম্মতগণ উহা পায় নাই । কি কারণে এই নেয়ামত দেওয়া হেইয়াছে এই ব্যাপারে বিভিন্ন রকম রেওয়ায়াত বর্ণিত আছ।

কোন কোন হাদীসে আসিয়াছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দেখিলেন যে,

পূর্ববর্তী উম্মতগণ দুনিয়াতে দীর্ঘদিন জীবিত থাকিতেন আর সেই ‍তুলনায় এই উম্মতের হায়াত খুবই কম,

এমতাবস্থায় কেহ যদি তাহাদের সমান নেক আমল করিতেও চায় তথাপি উহা সম্ভব নয়।

বিষয়টি চিন্তুা করিয়া আল্লাহর পেয়ারা নবীর খুবই কষ্ট হইল।

বস্তুতঃ এই ক্ষতিপূরণের জন্যই এই রাত্রি দান করা হইয়াছে।

যদি কোন ভাগ্যবান ব্যক্তি দশটি শবে কদরও পাইয়া যায় আর সে এইগুলিকে এবাদত বন্দেগীতে কাটাইয়া দেয়

তবে সে যেন আটশত তেত্রিশ বছর চার মাসেরও অধিক সময় পুরাপুরিভাবে এবাদতে কাটাইয়া দিল।

কোন কোন বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, একবার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

বনী ইসরাঈল গোত্রের এক ব্যক্তির আলোচনা প্রসঙ্গে বলিয়াছিলেন। ইহা শুনিয়া সাহাবায়ে কেরামের মনে ঈর্ষা হইল ।

অতঃপর তাহাদের ক্ষতিপূরণের জন্য আল্লাহ তায়ালা এই রাত্রটি দান করিলেন। এক রেওয়ায়াতে আছে যে,

একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনী ইসরাঈল গোত্রের চারজন নবী

–হযরত আইয়ুব (আঃ), হযরত যাকারিয়্যা (আঃ) হযরত হিযকীল (আঃ) ও হযরত ইউশা (আঃ) এর আলোচনা করিয়া বলিলেন যে,

তাঁহারা প্রত্যেকেই আশি বৎসর করিয়া এবাদতে মশগুল ছিলেন এবং চোখের এক পলক পরিমাণ সময়ও আল্লাহর নাফরমানী করেন নাই।

ইহা শুনিয়া সাহাবীগণ আশ্চার্যান্বিত হইলেন । পরক্ষণেই হযরত জিবরাঈল (আঃ) সূরায়ে কদর লইয়া হুযূরের খেদমতে হাজির হইলেন।

এই প্রসঙ্গে আরও বিভিন্ন রেওয়ায়াত বর্নিত আছে।

এইসব রেওয়ায়াতে বিভিন্নতার কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই হয় যে,

একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনা ঘটিবার পর যখন কোন আয়াত নাযিল হয়

তখন প্রত্যেক ঘটনাকেই উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ বলা যাইতে পারে।

এই সূরা নাযিল হওয়ার কারণ যাহাই হউক না কেন,

এই রাত্র আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হইতে উম্মতে মুহাম্মদীর প্রতি এক বিরাট দান ও বিরাট রহমত ।

আর এই রাত্রে এবাদত-বন্দেগীর ‍ুসুযোগও একমাত্র আল্লাহ তায়ালার তওফীকেই হইয়া থাকে।

অর্থাৎ, কিসমত যাহাদের শুন্য, তাহাদের জন্য যোগ্য পথপ্রদর্শক থাকিলেই বা কি হইবে,

যেমন খিজির (আঃ) সেকান্দর বাদশাকে আবে হায়াতের নিকট হইতে পিপাসার্ত অবস্থায় ফিরাইয়া লইয়া আসিয়াছেন।

কত সৌভাগ্যবান ঐ সকল মাশায়েখ যাহারা এই কথা বলিতে পারেন যে,

বালেগ হওয়ার পর হইতে আমার কখনও শবে কদরের এবাদত ছুটে নাই।

তবে এই মুবারক রাত্র ঠিক কোনটি? এই ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে র্দীর্ঘ মহ-পার্থক্য রহিয়াছে।

এই বিষয়ে প্রায় পঞ্চাশটি অভিমতগুলির আলোচনা সামনে আসিয়াতেছে।

হাদীসের কিতাবসমূহে এই রাত্রির বিভিন্ন রকমের ফযীলত সম্বলিত বহু রেওয়ায়াতে বর্ণিত হইয়াছে।

উহারও কিছু কিছু এখানে পেশ করা হইবে। কিন্তু এই রাত্রির ফযীলত যেহেতু স্বয়ং কুরআনে পাকে উল্লেখিত হইয়াছে।

এবং এইসম্বন্ধে একটি প্রথক সূরাও নাযিল হইয়াছে, কাজেই প্রথমে এই সূরার তফসীর লিখিয়া দেওয়া উত্তম মনে হইতেছে।

আয়াতের অর্থ হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর (রহঃ) এর ‘তফসীরে বয়ানুল করআন’ হইতে

এবং ফয়দাসমূহ অন্যান্য কিতাব হইতে লওয়া হইয়াছে।

অর্থঃ নিশ্চয় আমি এই কুরআনকে কদরের রাত্রিতে নাযিল করিয়াছি। (সূরা কদর, আয়াতঃ১)

ফায়দাঃ অর্থাৎ কুরআনে পাক লওহে মাহফূজ হইতে এই রাত্রিতে দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হইয়াছে।

এই একটি মাত্র বিষয়ই এই রাত্রির ফযীলতের জন্য যথেষ্ট ছিল যে,

কুরআনের ন্যায় এমন মহার্যাদাশীল জিনিসও এই রাত্রিতে নাযিল হইয়াছে।

তদুপরি ইহার সহিত আরও বহু বরকত ও ফযীলতও শামীল রহিয়াছে।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা এই রাত্রির প্রতি শওক ও আগ্রহ আরও বাড়াইবার জন্য এরশাদ করিতেছেন—

আপনি কি জানেন শবে কদর কত বড় জিনিস? (সূরা কদর, আয়াতঃ১)

অর্থাৎ, এই রাত্রের মহত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে আপনার কি জানা আছে যে,

ইহার মধ্যে কত গুণ- গরিমা ও কি পরিমাণ ফাযেয়েল রহিয়াছে!

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা নিজেই কয়েকটি ফাযায়েল উল্লেখ করেন।

শবে কদর হাজার মাসের চাইতেও উত্তম । (সূরা কদর, আয়াতঃ ৩)

অর্থাৎ হাজার মাস এবাদত করিলে যে পরিমাণ সওয়াব হইবে এক শবে কদরে এবাদত করিলে উহার চাইতেও জানা নাই।

‘এই রাত্রে ফেরেশতাগণ অবতীর্ণ হন।’ (সূরা কদর, আয়াতঃ ৪) আল্লামা রাযী (রহঃ) লিখেন যে,

ফেরেশতারা সৃষ্টির শুরুতে যখন তোমাকে দেখিয়াছিল, তখন তোমার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করিয়াছিল

এবং আল্লাহর দরবারে আরজ করিয়াছিল যে,

আপনি এমন এক জিনিস সৃষ্টি করিয়াছেন যাহারা দুনিয়াতে ফেৎনা –ফাসাদ ও রক্তপাত করিবে।

অতঃপর যখন পিতামাতা বীর্যের আকারে প্রথম দেখিয়াছিল তখন তোমাকে ঘৃণা করিয়াছিল,

এমনকি যদি তাহা কাপড়েলাগিয়া যাইত তবে ধুইয়া ফেলিত ।

কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যখন এই বীর্য-ফোটাকে উত্তম আকৃতি দান করিলেন তখন পিতামাতাওতাহাকে স্নেহ ও পেয়ার করিতে লাগিল ।

তদ্রূপ, আজ যখন তুমি আল্লাহর তওফীকে পুণ্যময় শবে কদরে আল্লাহর মারেফাত ও এবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত হইয়াছ

তখন ফেরেশতারাও তাহাদের পূর্বেকার মন্তব্যের ওজর পেশ করিতে দুনিয়াতে অবতরণ করে।

‘এবং এই রাত্রিতে রূহুল কুদুস অর্থাৎ হযরত জিবরাঈল (আঃ)ও অবতরণ করেন।’

(সূরা কদর, আয়াতঃ ৪) রূহ শব্দের অর্থ কি? এই সম্পর্কে মুফাসসিরগণের কয়েকটি অভিমত রহিয়াছে।

অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের অভিমত উহাই যাহা উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে।

আল্লামা রাযী (রহঃ) এই অভিমতকে সর্বাধিক বিশুদ্ধ বলিয়াছেন।

এখানে হযরত জিবরাঈল (আঃ) এর শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই ফেরেশতাদেরকে উল্লেখ করিবার পর খাছভাবে তাহার উল্লেখ করা হইয়াছে।

কেহ কেহ বলিয়াছেন যে, রূহ দ্বারা উদ্দেশ্য অনেক বড় একজন ফেরেশতা, যাহার নিকট সমস্ত আসমান যমীন একটি লোকমার সমান।

কেহ কেহ বলিয়াছেন, রূহ দ্বারা ফেরেশতাদের একটি খাছ জামাতকে বুঝানো হইয়াছে যাহাদেরকে অন্যান্য ফেরেশতাগণ শুধু শবে কদরেই দেখিয়া থাকেন।

চতুর্থ অভিমত হইল এই যে, রূহ দ্বারা আল্লাহ তায়ালার কোন খাছ মখলুখকে বুঝানো হইয়াছে,

যাহারা খানাপিনা করেন; কিন্তু ফেরেশতাও নহেন মানুষও নহেন।

পঞ্চম অভিমত হইল এই যে, রূহ দ্বারা হযরত ঈসা (আঃ) কে বুঝানো হইয়াছে।

তিনি উম্মতে মুহাম্মদীর এবাদত বন্দেগী দেখিবার জন্য ফেরেশতাদের সহিত অবতরণ করেন ।

ষষ্ঠ অভিমত হইল, রূহ আল্লাহ তায়ালার একটি খাছ রহমত।

অর্থাৎ, এই রাত্রে ফেরেশতাগণ অবতরণ করেন এবং তাহাদের পর আল্লাহ তায়ালার খাছ রহমত নাযিল হয় ।

ইহা ছাড়া আরও কয়েকটি অভিমত রহিয়াছে।

কিন্তু পথম অভিমতটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। ‘সুনানে বায়হকী’ কিতাবে হযরত আনাস (রাযিঃ) এর সুত্রে

নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরশাদ বর্ণিত হইয়াছে যে,

শবে কদরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) ফেরেশতাগণের একটি দলের সহিত অবতরণ করেন

এবং যে কোন ব্যক্তিকে যিকির বা অন্যান্য এবাদত-বন্দেগীতে মশগুল দেখিতে পান, তাহার জন্য রহমতের দোয়া করেন।

ফেরেশতাগণ তাহাদের পরওয়ারদিগারের হুকুমে প্রত্যেক ভাল ও কল্যাণকর বিষয় লইয়া জমিনের দিক অবতরণ করেন।(সূরা কদরঃ ৪)

মাযাহিরে হক’ কিতাবে আছে, এই কদরের রাত্রেই ফেরেশতাদের জন্ম হইয়াছে,

এবং এই রাত্রেই হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টি উপাদানসমূহ জমা হইতে শুরু হইয়াছে।

এই রাত্রেই জান্নাতে গাছ লাগানো হইয়াছে। আর এই রাত্রে অত্যাধিক পরিমাণে দোয়া ইত্যাদি কবুল হওয়া তো অনেক রেওয়ায়াতেই আসিয়াছে।

’দুররে মানসূরে’র এক রেওয়ায়াতে আছে, এই রাত্রে হযরত ঈসা (আঃ) কে আসমানে উঠান হইয়াছে।

এবং এই রাত্রেই বনী ইসরাঈল গোত্রের তওবা কবূল হইয়াছে।

‘এই রাত্রটি শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত সালাম ও শান্তি’ ।

অর্থাৎ সারা রাত্র ফেরেশতাদের পক্ষ হইতে মুমিনদের উপর সালাম বর্ষিত হইতে থাকে ।

কারণ, রাত্রভর ফেরেশতাদের এক জামাআত আসিতে থাকে এবং অপর জামাত যাইতে থাকে।

যেমন কোন কোন রেওয়ায়াতে এইভাবে ফেরেশতাদের একের পর এক জামাআত আসা-যাওয়ার কথা স্পষ্টরূপে বর্ণিত হইয়াছে।

অথবা এই আয়াতের অর্থ হইল এই যে, এই রাত্রটি পরিপূর্ণরূপে শান্তিময়; যে কোন ফেৎনা-ফাসাদ ইত্যাদি হইতে নিরাপদ।

‘এই রাত্র (উল্লেখিত বরকতসমূহ সহ) সুবহে সাদিক পর্যন্ত থাকে।’ (সূরা কদর, আয়াতঃ) এমন নয় যে,

এই বরকত রাত্রের কোন বিশেষ অংশে থাকে আর অন্যান্য অংশে থাকে না, বরং সমানভাবে সকাল পর্যন্তই এই বরকতসমূহের প্রকাশ ঘটিতে থাকে।

এই পবিত্র সূরার আলোচনার পর যাহাতে স্বয়ং আল্লাহ পাক এই রাত্রের কয়েক প্রকার ফযীলত ও বৈশিষ্ট্যের কথা

এরশাদ করিয়াছেন আর হাদীস উল্লেখ করার প্রয়োজন থাকে না ।

কিন্তু হাদীস শরীফেও এই রাত্রের বহু ফযীলত বর্ণিত হইয়াছে।

এখানে ঐ সমস্ত হাদীস হইতে মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করা হইয়াছে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন,

যে ব্যক্তি শবে কদরে ঈমানের সহিত এবং সওয়াবের নিয়তে এবাদতের জন্য দাঁড়ায়,

তাহার পিছনের সমস্ত গোনাহ মাফ করিয়া দেওয়া হয়।

ফায়দাঃ

দাঁড়াইবার অর্থ হইল, সে নামায পড়ে। অনুরূপভাবে অন্যান্য এবাদত যেমন তেলাওয়াত যিকির ইত্যাদি

এবাদতে মশগুল হওয়াও ইহার অন্তর্ভুক্ত । সওয়াবের নিয়ত ও আশা রাখিবার অর্থ হইল,

রিয়া অর্থাৎ মানুষকে দেখান বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে না দাঁড়ায়।

বরং এখলাসের সহিতে দাঁড়াইবে। খাত্তাবী (রহঃ) বলেন, ইহার অর্থ হইল,

বুঝিয়া শুনিয়া সওয়াবের একীন করিয়া মনের আনন্দ ও শওকের সহিত দাঁড়াইবে।

বোঝা মনে করিয়া মনের অনিচ্ছায় নয় । আর ইহা তো স্পষ্ট কথা যে,

সওয়াবের একীন যত বেশী হইবে এবাদতে কষ্ট সহ্য করা ততই সহজ হইবে।

এই কারণেই আল্লাহর নৈকট্য লাভে যে যত বেশী তরক্কী করিতে থাকে এবাদত-বন্দেগীতে তাহার মগ্নতা ততই বাড়িয়া যায়।

এখানে এই কথাও জানিয়া রাখা জরুরী যে, উপরোল্লিখিত হাদীস বা অন্যান্য যেসব হাদীসে

গোনাহ মাফের কথা বলা হইয়াছে,ওলামায়ে কেরামের মতে উহার দ্বারা সগীরা গোনাহকে বুজানো হইয়াছে।

কেননা কুরআন পাকে যেখানে কবীরা গোনাহের কথা আসিয়াছে সেখানেই অর্থাৎ, ’তবে যাহারা তওবা করে’ এই বাক্যসহ উল্লেখ করা হইয়াছে।

এই জন্যই ওলামায়ে কেরামের  সর্বসম্মত অভিমত হইল,কবীরা গোনাহ তওবা ছাড়া মাফ হয় না।

সুতরাং হাদীস শরীফে যেখানেই গোনাহ মাফের কথা উল্লেখ রহিয়াছে,

ওলামায়ে কেরাম সেই গোনাহগুলিকে সগীরা গোনাহ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন।

আমার আব্বাজান (রহঃ) বলিতেন, হাদীস শরীফে গোনাহ দ্বারা

সগীরা গোনাহ উদ্দেশ্য হওয়া সত্বেও সগীরা  গোনাহের কথা দুই কারণে উল্লেখ করা হয় না।

প্রথমতঃ

মুসলমানের এমন অবস্থা কল্পনাই করা যায় না যে, তাহার উপর কবীরা গোনাহের কোন বোঝা থাকিতে পারে ।

কেননা, তাহার দ্বারা কোন কবীরা গোনাহ হইয়া গেলে তওবা না করা পর্যন্ত সে স্থির হইতেই পারিবে না ।

দ্বিতীয়তঃ

যখন শবে কদরের মত এবাদতের বিশেষ কোন সুযোগ আসে মুসলমান সওয়াবের নিয়তে এবাদত-বন্দেগী করে

তখন প্রকৃত মুসলমান নিজের বদ আমলসমূহের জন্য অবশ্যই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় ।

এইভাবে আপনা আপনিই তাহার তওবা হইয়া যায়।

কেননা বিগত গোনাহ না করার পাকা এরাদা ও দৃঢ় অঙ্গীকার করার নামই হইল তওবা।

সুতরাং যদি কাহারও দ্বারা কবীরা গোনাহ হইয়া যায় তবে জরুরী হইল,

শবে কদর বা দোয়া কবূলের অন্য কোন সময়ে নিজের জরুরী হইল,

শবে কদর বা দোয়া কবূলের অন্য কোন সময়ে নিজের গোনাহসমূহের জন্য,

মনে প্রাণে অত্যন্ত দৃঢ়তার সহিত আন্তরিক ও মৌখিকভাবে তওবা করিয়া নেওয়া।

যাহাতে আল্লাহ তায়ালার পুরাপুরি রহমত তাহার উপর বর্ষিত হয়

এবং সগীরা ও কবীরা সকল প্রকার গোনাহ মাফ হইয়া যায়।

যদি স্মরণ আসিয়া যায় তবে অধম গোনাহগারকেও আপনাদের এখলাসপূর্ণ দোয়ায় শরীক করিবেন।

হযরত আনাস (রাযিঃ) বলেন, একবার রমযান মাস আসিলে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইলেন,

তোমাদের নিকট একটি মাস আসিয়াছে। উহাতে একটি রাত্র আছে যাহা হাজার মাস হইতেও উত্তম।

যে ব্যক্তি এই রাত্র হইতে মাহরূম থাকিয়া গেল সে যেন সমস্ত ভালাই ও কল্যাণ হইতে মাহরূম থাকিয়া গেল ।

আর এই রাত্রির কল্যাণ হইতে কেবল ঐ ব্যক্তিই মাহরূম থাকে যে প্রকৃতপক্ষেই মাহরূম। (তারগীবঃ ইবনে মাজাহ)

ফায়দাঃ

যে ব্যক্তি এত বড় নেয়ামত নিজের হাত ছাড়িয়া দেয় প্রকৃতপক্ষেই তাহার মারূম হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।

একজন রেল – কর্মচারী যদি কয়েকটি কড়ির জন্য সারারাত্র জাগিয়া থাকিতে পারে তাহা হইলে আশি বৎসরের  এবাদতের জন্য

একমাস রাত্র জাগিয়া থাকিলে অসুবিধার কি আছে?

আসল কথা হইল দিলের মধ্যে সেই জ্বালা ও তাড়ানাই নাই ।

তবে কোনক্রমে একটু স্বাদ পাইয়া গেলে এক রাত্র কেন শত শত রাত্রও জাগিয়া থাকা যায়।

‘মহব্বতের জগতে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ও ভঙ্গ করা উভয় সমান।

প্রত্যেক জিনিসের মধ্যেই মজা পাওয়া যায় যদি অন্তরে মজা থাকে’।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য অসংখ্য সুসংবাদ ও উচ্চ মর্যাদার ওয়াদা ছিল,

যেগুলির প্রতি তাঁহার পুরাপুরি একীন থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন এত লম্বা নামায পড়িতেন যে,

তাঁহারই মহব্বতের দাবীদার হইয়া কি করিতে?

তবে হ্যাঁ, যাহারা এইসব বিষয়ের কদর করিয়াছেন তাঁহারা সবকিছুই করিয়া গিয়াছেন

এবং নিজেরা নমুনা হইয়া  উম্মতকে দেখাইয়া গিয়াছেন।

কাহারও এই কথা বলার আর সুযোগ থাকে নাই যে,

হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায় এবাদত করার সাহস কে করিতে পারে আর কাহার দ্বারাই বা সম্ভব?

আসলে মনে ধরার ব্যাপার, ইচ্ছা থাকিলে পাহাড় খুঁড়িয়াও  দুধের নহর বাহির করা মুশকিল নয়।

কিন্তু এই জিনিস হাসিল হওয়া কাহারও জুতা সোজা করা ব্যতীত (অর্থাৎ কোন আল্লাহওয়ালার হাতে নিজেকে সোপর্দ করা ব্যতীত) খুবই মুশকিল ।

‘অন্তরে দরদ হাসিল করিতে হইলে ফকীর –দরবেশ আল্লাহওয়ালাদের খেদমত কর,

কেননা এই মহামূল্য মণিমুক্তা রাজা-বাদশার ভান্ডারেও পাইবে না।’

হযরত ওমর (রাযিঃ) কি কারণে এশার নামাযের পর বাড়িতে গিয়া সকাল  পর্যন্ত নফল  নামাযে কাটাইয়া দিতেন।

হযরত ওসমান (রাযিঃ) রাত্রের প্রথম অংশে সামান্য সময়ের জন্য শুইতেন।

রাত্রে এক  এক রাকাতে পুরা কুরআন শরীফ খতম করিয়া ফেলিতেন ।

‘শরহে এহইয়া’ কিতাবে আবূ তালেব মক্কী (রহঃ) হইতে বর্ণনা করা হইয়াছে যে,

চল্লিশজন তাবেয়ী সম্পর্কে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সনদে প্রমাণিত  আছে যে,

তাঁহারা এশার নামাযের ওজু দ্বারা ফজরের নামায পড়িতেন।

হযরত শাদ্দাদ (রহঃ) রাত্রে শুইতেন আর এ পাশে ও পাশ করিতে করিতে সকাল করিয়া দিতেন

এবং বলিতেন, হে আল্লাহ! আগুনের ভয় আমার ঘুম উড়াইয়া দিয়াছে।

হযরত আসওয়াদ আবনে ইয়াযীদ (রহঃ) রমযান মাসে শুধু  মাগরিব ও এশার মাঝখানে সামান্য সময় ঘুমাইতেন।

হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রহঃ) সম্পর্কে বর্ণিত যে, তিনি পঞ্চাশ বৎসর পর্যন্ত  এশার ওজু দিয়া ফজরের নামায পড়িয়াছেন।

হযরত সিলাহ ইবনে আশয়াম (রহঃ) সারা রাত্র নামায পড়িতেন আর সকালে এই দোয়া করিতেন-

হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট জান্নাত চাহিবার যোগ্য তো নই।

শুধু এতটুকু দরখাস্ত করিতেছি যে, আমাকে দোযখের আগুন হইতে বাঁচাইয়া দিন ।

হযরত  কাতাদা (রহঃ) পুরা রমযান মাসে প্রতি রাত্রে একবার কোরআন শরীফ খতম করিতেন।

হযরত ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত এশার ওজু দিয়া ফজরের নামায পড়িয়াছেন,

ইহা এত প্রসিদ্ধ ঘটনা যে, ইহাকে অস্বীকার করিলে ইতিহাসের উপর হইতে আস্থা উঠিয়া যায়।

ইমাম সাহেবকে যখন জিজ্ঞাসা করা হইল যে, আপনি এই শক্তি কিভাবে অর্জন করিলেন?

জবাবে তিনি বলিলেন, আমি আল্লাহর নামসমূহের তোফায়েলে এক বিশেষ তরিকায় দোয়া করিয়াছিলাম।

ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) শুধুমাত্র দুপুরে সামান্য সময়ের জন্য শুইতেন;

তিনি বলিতেন, হাদীস শরীফ ‘কায়লুলা’ করার কথা এরশাদ হইয়াছে।

বস্তুতঃ দুপুরে শোয়ার মধ্যেও সুন্নতের অনুসরণের নিয়ত থাকিত ।

কুরআন শরীফ তেলাওয়াতের সময় তিনি এত কাঁদিতেন যে, প্রতিবেশীদেরও দয়া আসিয়া যাইত।

একবার এই আয়াত পাড়িতে পড়িতে সারারাত্র কাঁদিয়া কাটাইয়া দিয়াছেন।

হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম (রহঃ) রমযান মাসে রাত্রেও ঘুমাইতেন না এবং দিনেও ঘুমাইতেন না ।

হযরত ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) পুরা রমযান মাসে দিবা- রাত্রির নামাযে ষাটবার কুরআন শরীফ খতম করিতেন।

এইগুলি ছাড়াও বুযুর্গানে দ্বীনের আরও শত শত ঘটনা রহিয়াছে।

তাহারা আল্লাহর বানী  ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার এবাদতের জন্যই সৃষ্টি করিয়াছি’ ইহার অর্থকে সত্যে পরিণত করিয়া প্রমাণ করিয়া গিয়াছেন যে,

যাহারা এবাদত করিতে চায় তাহাদের জন্য এইরূপ এবাদত করা কোন মুশকিল নয় ।

এই হইল আমাদের পূর্ববর্তী  বুযুর্গদের ঘটনাবলী । তবে এবাদতকারী এখনও বিদ্যমান রহিয়াছেন।

পূর্ববর্তীদের মত মুজাহাদা না হউক; কিন্তু নিজেদের যমানা ও শক্তি- সামর্থ্য অনুযায়ী পূর্ববর্তী  বুযুর্গদের নমুনা এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে।

এই ফেৎনা-ফাসাদের যুগেও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যিকার অনুসরণকারীদের অস্তিত্ব রহিয়াছে,

যাহাদের জন্য আরাম –আয়েশ এবং দুনিয়াবী কর্মব্যস্ততা কোনটাই তাহাদের এবাদতের মগ্নতায় বাধা হয় না ।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমান, আল্লাহ তায়ালা এরশাদ ফরমাইয়াছেন,

‘হে আদম সন্তান! তুমি আমার এবাদতের জন্য অবসর হইয়া যাও আমি তোমার অন্তরকে সচ্ছলতায় ভরিয়া দিব,

তোমার অভাব-অনটন দূর করিয়া দিব। নতুবা তোমার অন্তরকে বিভিন্ন ব্যস্ততার দ্বারা ভরপুর করিয়া দিব

এবং তোমার অভাব- অনটনও দূর হইবে না। প্রতিদিনের বাস্তব ঘটনাবলী এই সত্য বাণীর সাক্ষ্য দিতেছেন।

এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে বুযুর্গানে দ্বীনের লিখিত কিতাবসমূহ দেখিতে পারেন।

و اخر دعوان ان الحمدلله رب العلمين

আরো পড়ুন 👇👇👇

https://wp.me/pauLLn-A1   https://wp.me/pauLLn-yO   https://wp.me/pauLLn-zP

https://wp.me/pauLLn-zJ   https://wp.me/pauLLn-z7      https://wp.me/pauLLn-zq

About নঙ্গে আসলাফ আফজাল

নঙ্গে আসলাফ আফজাল ১৯৯৫ সালের ১৪ ই এপ্রিল মাসে জন্মগ্রহণ করেন।২০১২ হিফজ সম্পন্ন করেন মাদ্রাসা দাওয়াতুল হক দেওনা,গাজীপুর, ঢাকা থেকে। উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন২০১৬ সনে ইসলামাবাদ মাদ্রাসা বি-বাড়িয়া থেকে। দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স)সম্পন্ন করেন ২০২০ সনে শাহ সুলতান রহঃ মাদ্রাসা সিলেট থেকে।তিনি লেখা-লেখিতে অভ্যস্ত, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার লিখা প্রকাশ করা হয়েছে। Muslimbd24.com এ তার দৈনিক ইসলামী নিউজ সহ বিভিন্ন লিখা প্রকাশিত হয়। ঠিকানা: বালাগঞ্জ, সিলেট। মোবাইল নাম্বার:০১৭১৪৪৭৫৭৪৫ ইমেইল: hafijafjal601@gmail.com ইউটিউব চ্যানেলঃ https://www.youtube.com/channel/UCocSpOf_nj57ERq1QorZA6A

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Powered by themekiller.com